ঢাকা , সোমবার, ২৩ মার্চ ২০২৬ , ৮ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ভোটের উত্তেজনায় রাজনীতি, কী ভাবছেন সাধারণ মানুষ?

ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় : ২১-০১-২০২৬ ০৭:০৯:১৯ পূর্বাহ্ন
আপডেট সময় : ২১-০১-২০২৬ ০৭:০৯:১৯ পূর্বাহ্ন
ভোটের উত্তেজনায় রাজনীতি, কী ভাবছেন সাধারণ মানুষ?
নির্বাচন এলেই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ভোট নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য, কর্মসূচি, অভিযোগ আর সন্দেহ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি হয়ে ওঠে অস্থির। এই উত্তেজনা শুধু রাজনীতির ময়দানেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনেও। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। ইতোমধ্যে নির্বাচনি উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে দেশজুড়ে। 

রাজধানীর ফার্মগেট এলাকার একটি ব্যস্ত মোড়ে রিকশা থামিয়ে কথা হয় আবদুল করিমের সঙ্গে। বয়স প্রায় পঞ্চাশ। বাড়ি মাদারীপুর সদর উপজেলায়। ১২ বছর ধরে ঢাকায় রিকশা চালিয়ে সংসার চালাচ্ছেন। তিনি বলেন, 'নির্বাচন মানেই আমাদের জন্য ভয়। আগেও দেখেছি, রাজনীতি গরম হলে হঠাৎ হরতাল, মিছিল, সংঘর্ষ শুরু হয়। রাস্তায় মানুষ কমে যায়, যাত্রী পাওয়া যায় না। দুই-তিন দিন আয় না হলে ঘরে চুলা জ্বালানো দায় হয়ে পড়ে। রাজনীতি বড় লোকের খেলা হলেও ভুগতে হয় আমাদের মতো গরিব মানুষকে।'

আবদুল করিম জানান, আগের কয়েকটি নির্বাচনের সময় সহিংসতার কারণে একাধিক দিন রিকশা বের করতে পারেননি। পুলিশি তল্লাশি, সড়ক অবরোধ, ভাঙচুর—সব মিলিয়ে আতঙ্কের মধ্যেই দিন কাটাতে হয়েছে। পরিবার গ্রামের বাড়িতে থাকলেও প্রতিদিনের আয়ের ওপর নির্ভর করেই সংসার চলে। নির্বাচন এলেই সেই আয়ের নিশ্চয়তা থাকে না।
নিউমার্কেট এলাকায় কেনাকাটা করতে আসা গৃহিণী রাশেদা বেগমের উদ্বেগও কম নয়। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। স্বামী একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। তিনি বলেন, 'ভোট হওয়া দরকার, এটা নিয়ে আপত্তি নেই। কিন্তু যেভাবে রাজনৈতিক দলগুলো মুখোমুখি অবস্থানে যাচ্ছে, তাতে ভয় লাগে। সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে মন চায় না। বাজারে বের হলে অজানা আতঙ্ক কাজ করে—কখন কোথায় কী ঘটে যায়। রাজনৈতিক অস্থিরতা সাধারণ মানুষের মানসিক শান্তি কেড়ে নিচ্ছে।'

 

তরুণদের ভাবনাতেও মিশে আছে আশা আর শঙ্কা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী নাহিদ ইসলাম বলেন, 'ভোটাধিকার একটি মৌলিক নাগরিক অধিকার। তরুণ প্রজন্ম হিসেবে আমরা চাই অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। কিন্তু যখন দেখি রাজনৈতিক দলগুলো একে অপরকে শত্রু মনে করে রাজপথে শক্তি প্রদর্শনে নেমেছে, তখন ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা হয়।’ তিনি বলেন, ‘সহিংস পরিবেশ তৈরি হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তরুণ সমাজ—পড়াশোনা, ক্যারিয়ার পরিকল্পনা সবকিছু অনিশ্চয়তায় পড়ে যায়।'

 

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখপাত্র সিনথিয়া জাহিন আয়েশা ঢাকা মেইলকে বলেন, '২০২৪ সালে হাজারো শহীদের রক্তের বিনিময়ে যে সরকার গঠিত হয়েছে এবং যে নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব নিয়েছে, তাদের প্রধান দায়িত্ব হলো দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ মানের স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক একটি নির্বাচন উপহার দেওয়া।’ 

তিনি বলেন, ‘এই দায়িত্ব এড়ানো কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ আন্দোলনকারীদের ত্যাগ ও শহীদদের আত্মত্যাগের সম্মান রাখার দায়িত্ব তাদের ওপর বর্তায়।'
 

তিনি আরও বলেন, 'ঋণখেলাপি শুধু একটি আর্থিক অপরাধ নয়, এটি রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটের প্রতীক। যারা জনগণের টাকা আত্মসাৎ করেছে, তাদেরকে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বৈধতা দিলে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে লুটেরাদের হাতে তুলে দেওয়ার পাঁয়তারা চালানো হবে। তাই প্রার্থীদের নৈতিকতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না করলে নির্বাচন শুদ্ধ নয়, বরং গণতন্ত্রের মূল চেতনা নস্যাৎ হবে।'

শহরের বাইরেও একই রকম উৎকণ্ঠা। রাজশাহীর পবা উপজেলার কৃষক আব্দুল মালেক প্রায় ২০ বছর ধরে কৃষিকাজ করছেন। তিনি বলেন, নির্বাচনের সময় রাজনীতি গরম হলে আমাদের কাজকর্ম থমকে যায়। সার-বীজ আনতে বাজারে যেতে ভয় লাগে। অনেক সময় পরিবহন বন্ধ থাকে। ফসল মাঠে থাকলেও ঠিকমতো পরিচর্যা করা যায় না। 
 

ব্যবসায়ীরাও এই সময়টাকে দেখেন শঙ্কার চোখে। পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সেলিম ১৫ বছর ধরে কাপড়ের ব্যবসা করছেন। তিনি বলেন, 'নির্বাচন ঘিরে অস্থিরতা বাড়লে ক্রেতা কমে যায়। মালামাল আনা–নেওয়ায় সমস্যা হয়। অনেক সময় দোকান খোলা রাখা যায় না। রাজনৈতিক পরিস্থিতি অশান্ত হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় ছোট ব্যবসায়ীরা, যাদের পুঁজি সীমিত।'

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ভোটকে ঘিরে উত্তেজনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন নয়। তবে সমস্যা তৈরি হয় যখন এই উত্তেজনা সহিংসতা, ভয়ভীতি ও অনিশ্চয়তায় রূপ নেয়। তখন সাধারণ মানুষ নিজেদের নিরাপত্তা, জীবিকা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর দুশ্চিন্তায় পড়ে। রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ, পারস্পরিক সংলাপ ও সহনশীলতা ছাড়া এই সংকট কাটিয়ে ওঠা কঠিন।

 

নিউজটি আপডেট করেছেন : News Upload

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ